অজয় রায় চেয়েছিলেন শোষণ-নিপীড়নমুক্ত বাংলাদেশ

জয়ন্তী রায়

image

১৭ অক্টোবর রাজনীতিবিদ ও সমাজ চিন্তক অজয় রায়ের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালের এই দিন ৮৭ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি যেমন একটি দীর্ঘ জীবন পেয়েছিলেন, তেমনি এই জীবনকে তিনি উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের জন্য। শোষণ, বৈষম্য এবং সব ধরনের নিপীড়নমুক্ত একটি সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তিনি আমৃত্যু নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন। একেবারে স্কুল জীবন থেকেই সমাজতন্ত্রকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। পরিবেশ কখনও তার কাজের বা স্বপ্ন প্রতিষ্ঠার অনুকূলে ছিল না। কিন্তু বাধা-বিপত্তি উপেক্ষা করেই তিনি কাজ করেছেন। মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠা- তাকে প্রতিকূলতা উপেক্ষা করার শক্তি জুগিয়েছে। তিনি নিজের বা পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধির কথা ভাবেননি। ভেবেছেন সব মানুষের কথা। সবার পেটে খাবার জুটবে, মাথার ওপর ছাদ থাকবে, পরনে কাপড় থাকবে, শিক্ষার সুযোগ থাকবে, রোগে উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা হবে, কাজ থাকবে- এমন একটি দেশের জন্যই তিনি ১৫ বছর কারাগারে কাটিয়েছেন, বছরের পর বছর কাটিয়েছেন আত্মগোপনে।

অজয় রায় ১৯২৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। সেখানে তার মাতামহ মদন দত্ত আইন ব্যবসায় নিয়োজিত ছিলেন। তার পৈত্রিক বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদি উপজেলার বনগ্রামে। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে অজয় রায় ছিলেন সবার বড়। তার বাবা ড. প্রমথ নাথ রায় ছিলেন ভারতের বানারসি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদেশি ভাষার অধ্যাপক। তিনি একাধিক ভাষায় সুপন্ডিত ছিলেন। মা কল্যাণী রায় ছিলেন গৃহবধূ। অজয় রায়ের প্রাথমিক শিক্ষা জীবন বারানসীতেই শুরু। বারানসী বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৪৫ সালে আইএসসি পাস করেন। বারানসীতেই তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন এবং সক্রিয় কমিউনিস্ট হয়ে ওঠেন।

১৯৪৪ সালে তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। এক বছরের ব্যবধানে মা-ও চলে যান। ফলে বাধ্য হয়ে অজয় রায়কে ছোট ভাইবোনদের নিয়ে বনগ্রামে ফিরে আসতে হয়। সেখানে ঠাকুরদার তত্ত্বাবধানে ভাইবোনদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করে নিজে ১৯৪৬ সালে ঢাকার মুন্সীগঞ্জের হরগঙ্গা কলেজে বিকম শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালে তিনি বিকম পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। এরমধ্যে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির কার্যক্রম থেকে সরে না গিয়ে বরং আরও বেশি সক্রিয় হন। ছাত্র জীবন থেকেই তার জেলজীবনও শুরু হয়। বিকম পাস করে কিছুদিন একটি হাইস্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন। পাকিস্তানের প্রায় পুরোটা সময় তার কেটেছে কারাগারে। জেল থেকে পরীক্ষা দিয়েই তিনি অর্থনীতিতে কৃতিত্বের সঙ্গে এমএ পাস করেছিলেন।

অজয় রায় ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী একজন মানুষ। রাজনীতির পাশাপাশি তিনি লেখালেখিও করতেন। তার লেখা বইয়ের সংখ্যা ২০টি। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো : বাঙলা ও বাঙালি, বাংলাদেশের অর্থনীতির অতীত ও বর্তমান, বাংলাদেশের ভূমি ব্যবস্থার সংকট ও সমাধান, বাংলার কৃষক বিদ্রোহ, রাজনীতির অ, আ, ক, খ আমাদের জাতীয় বিকাশের ধারা, বাংলাদেশের বামপন্থি আন্দোলন ইত্যাদি। তীরের অন্বেষায় নামে একটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থও তিনি লিখেছেন। বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে তিনি নিয়মিত কলামও লিখতেন।

৮৭তম জন্মদিন উদযাপন উপলক্ষে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা সভায় তিনি বলেছিলেন, ‘স্কুলে থাকাকালেই সূচনা হয়েছিল সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারার সঙ্গে পরিচয়। এজন্য পথচলার কর্তব্য নির্ধারণে সমস্যা হয়নি। গত ছয়-সাত দশকে উত্থান-পতনের মোকাবিলা তো কম করতে হলো না আমাদের। ... কোন কোন সময় হতাশা যে প্রভাব বিস্তার করতে না চেয়েছে তা নয়। কিন্তু তারপরও শেষ পর্যন্ত হতাশা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে একদিকে যেমন ইতিহাসের গতিধারার অনিবার্যতার ওপর আস্থার কারণে, অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের সেই অমর ঘোষণা-মানুষের ওপর বিশ্বাস হারানো পাপ- তার ওপর আস্থা রাখতে পারায়। বলতে দ্বিধা নেই, এই বিশ্বাসই যেমন সব সংকট মুহূর্তে রক্ষা করেছে আমাকে, তেমনি আশাবাদী করে তুলেছে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এবং উৎসাহিত করেছে পরিবর্তনের ধারায় প্রবহমানতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পথ চলার ক্রমাগত প্রয়াসে’।

অজয় রায় মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। লাখো শহীদের আত্মদানে অর্জিত স্বদেশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের ‘সোনার বাংলা’ হবে- এটা ছিল অজয় রায়ের বিশ্বাস এবং লক্ষ্য এই লক্ষ্য অর্জনে নিজেও নানামুখী কাজ করেছেন। মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আনার জন্য শিক্ষা-সংস্কৃতির বিস্তারে তিনি আগ্রহ নিয়ে কাজ করেছেন। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে থেকে মানুষকে সংগঠিত ও সচেতন করার কাজে শ্রম ও মেধা ব্যয় করেছেন।

গত শতকের নব্বইয়ের দশকের একপর্যায়ে মতাদর্শিক ভিন্নতায় তিনি কমিউনিস্ট পার্টি থেকে নিজেকে বিছিন্ন করলেও মুহূর্তের জন্যও মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করেননি। তিনি সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন নামে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলে সব ধরনের নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার কাজ করেছেন আমৃত্যু। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা যেখানেই দেখা গেছে সেখানেই তিনি পরিণত বয়সেও ছুটে গেছেন। জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের উত্থানের বিপদ তিনি উপলব্ধি করতেন বলেই তার বিরুদ্ধে লেখালেখি করার পাশাপাশি রাজপথে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদও সংঘটিত করেছেন। তিনি ছিলেন সদাসক্রিয় মানুষ। প্রায় ৪৭ বছরের সংসার জীবনে অত্যন্ত কাছে থেকে তাকে দেখা ও বোঝার সুযোগ আমার হয়েছিল। মানুষের মঙ্গল চিন্তা ছাড়া তিনি আর কিছুই ভাবতেন না। এজন্য তার প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসার মানুষের সংখ্যাও কম নয়। তার শেষ শয্যা পাতা হয়েছে বনগ্রামের মাটিতে। সেখানে একটি স্মৃতিসৌধ গড়ে তোলা হয়েছে। এই স্মৃতিসৌধ ডিজাইন ও নির্মাণ করে দিয়েছেন একুশে পদকপ্রাপ্ত স্থপতি রবিউল হোসাইন। স্মৃতিসৌধ উদ্বোধনের দিন ইত্তেফাক সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের নোভা আহমেদ চৌধুরী, সাবেক আইজিপি ও সংসদ সদস্য নূর মোহাম্মদ, অজয় রায়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা পংকজ ভট্টাচার্য, শেখর দত্তসহ অনেকের উপস্থিতি তার প্রতি ভালোবাসারই বহিঃপ্রকাশ।

তার পৈত্রিক বাড়ির কাছের একটি স্কুলের ১৪ জন দরিদ্র অথচ মেধাবী শিক্ষার্থীকে বৃত্তি দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে পরিবারের পক্ষ থেকে। প্রতি বছর তার জন্মদিন ৩০ ডিসেম্বর এই বৃত্তি প্রদান করা হয়। অজয় রায় বিত্তবান বলতে যা বোঝায় তা ছিলেন না। তবে তার চিত্তের প্রসারতা ছিল। তাই তার নামে বৃত্তি দিয়ে শিক্ষার্থীদের তার আদর্শের অনুগামী হতে উদ্বুদ্ধ করাই আমাদের উদ্দেশ্য।

আজ অজয় রায়ের মৃত্যু দিবসের মুহূর্তে দেশে নারীর প্রতি সহিংসতার একের পর এক খবর শুনে বিচলিত বোধ না করে পারছি না। একশ্রেণীর মানুষ কেন এমন বেপরোয়া, উশৃঙ্খল হয়ে উঠছে? ধর্ষণকামী হয়ে ওঠার পেছনে কি সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ আছে তা খুঁজে দেখা দরকার। অজয় রায় তো এমন বাংলাদেশ চাননি। একটি সুন্দর দেশ -সাম্য ও সৌহার্দ্যরে দেশই তো তার এবং তার মতো আরো আত্মত্যাগী রাজনীতিমনস্ক মানুষের মনে জাগ্রত ছিল। অথচ আজ স্বাধীনতার এতো বছর পরও কেন একটি মানবিক দেশ আমরা গড়ে তুলতে পারলাম না। কোথায় ক্রুটি, কোথায় ব্যর্থতা? অজয় রায়কে যারা ভালোবাসেন, তাকে যারা শ্রদ্ধা করেন, তাদের আজ আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি হওয়া প্রয়োজন। নতুন প্রজন্মকে আলোকিত করা, তাদের সামনে সঠিক পথনির্দেশনা দেয়া আজ জাতীয় কর্তব্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা যদি বাংলাদেশকে নারী-পুরুষ, গরিব-নিঃস্ব, ধর্ম পরিচয় নির্বিশেষে সব মানুষের নিরাপদ বাসভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে পারি তাহলেই অজয় রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হবে।

নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে

করোনা মহামারীর মধ্যেই ২০ অক্টোবর অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার জেলা-উপজেলা পরিষদের দুই শতাধিক নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল

শিশুশিক্ষার সাতকাহন

পৃথিবীতে এখনও প্রতিনিয়ত তান্ডব চালাচ্ছে করোনাভাইরাস। কোভিড-১৯ ভাইরাসের কারণে সারা বিশ্বে আজ মহামারী দেখা দিয়েছে।

ঐক্যের শিক্ষায় শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা

image

দুর্গাপূজার ইতিকথা ও বাংলায় দুর্গোৎসবের প্রচলন

ঢাকে কাঠি পড়বে, বাজবে শঙ্খ, মন্ডপ মন্ডপে ধুপের সুগন্ধি, ভক্তকুলের আরাধনা আর ধনুচি নাচে মেতে উঠবে সব সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দুর্গাপূজা বলে কথা।

দুর্গাপূজার ইতিকথা ও বাংলায় দুর্গোৎসবের প্রচলন

ঢাকে কাঠি পড়বে, বাজবে শঙ্খ, মন্ডপ মন্ডপে ধুপের সুগন্ধি, ভক্তকুলের আরাধনা আর ধনুচি নাচে মেতে উঠবে সব সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দুর্গাপূজা বলে কথা। ষষ্ঠী থেকে দশমী চলবে দেবী বন্দনা।

আল্লাহর দুনিয়ায় জমির অভাব নেই

সুপ্রিমকোর্টের রায়ের ভিত্তিতে ভারতের অযোধ্যায় ৫০০ বছরের পুরনো বাবরি মসজিদের জায়গায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি রামমন্দির নির্মাণের সূচনা করেছেন।

দেবীর আগমনে মঙ্গলের প্রত্যাশা

image

করোনাকালে সামাজিক দূরত্ব

আজ থেকে ২৫/৩০ বছর আগের কথা। শহরের অনেকের প্রিয় শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি, বাড়ির দ্বিতীয় তলায় থাকতেন।

প্রয়োজন নির্মল বায়ু

মানুষ, উদ্ভিদ এবং জীবজন্ত সবকিছুর বেঁচে থাকার জন্য সুস্থ পরিবেশ প্রয়োজন।