download

আইনের গ্যাঁড়াকলে তিন দশক শ্রমিকের পাওনাদি

নার্গিস আক্তার

এ আর হাওলাদার জুট মিল মাদারীপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এই মিলে প্রায় ১৪০০ শ্রমিক কাজ করতেন। এই মিলকে ঘিরে মাদারীপুর শহর তখন জমজমাট ছিল। নব্বইয়ের দশকে মালিকপক্ষ কোন রকম ঘোষণা ছাড়াই, শ্রমিকদের পাওনাদি না দিয়েই মিল বন্ধ করে দেন। আমার বাবা মরহুম আনিসুর রহমান এই মিলেরই একজন শ্রমিক ছিলেন। তিনি শ্রমিকদের পাওনাদি আদায়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। তার প্রচেষ্টায় ব্যারিস্টার সারা হোসেন ও আদিলুর রহমান খানের সহায়তায় মাদারীপুর লিগ্যাল এইড অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে শ্রমিকদের পাওনা আদায়ের জন্য মজুরি মামলা দায়ের করেন। মামলা চলাকালীন সময় এক রকম বিনা চিকিৎসায় ১৯৯৬ সালে ২২ জুন বাবা মারা যান। এর পর মামলা পরিচালনার হাল ধরেন আরেক শ্রমিক আলাউদ্দিন মিয়া। মজুরি পরিশোধ মোকদ্দমা নং ১১৪/১৯৯৮। মাননীয় মজুরি পরিশোধ কর্তৃপক্ষ চেয়ারম্যান দ্বিতীয় শ্রম আদালত ঢাকা ৩০/৪/২০০০ ইং তারিখে আদেশ দেন ৩০ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের পাওনাদি পরিশোধের।

মালিকপক্ষ ৩০ দিনের মধ্যে শ্রমিকদের পাওনাদি না দেয়ায়, সার্টিফিকেট মামলা নং ২০৯/২০০১ ইং দাইক বিবাদীর মালামাল ক্রোক করে বাদীর পাওনাদি পরিশোধের আদেশ দেন। এই আদেশেরও মালিকপক্ষ কর্ণপাত না করায় ১৬/১/২০০৩ ইং তারিখে ১৯৯৩ সালের সরকারি দাবি আদায় আইনের ধারা ২০৯/২০০১ গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। এর মাঝে আরও দুটি সংগঠন বাংলাদেশে লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) ও আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) আইনি সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন শ্রমিকদের পাওনাদি আদায়ের জন্য। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জন্মলগ্ন থেকেই সুবিধাবঞ্চিত মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় হাওলাদার জুট মিলের শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা আদায়ের জন্য দীর্ঘদিন যাবৎ আইনি সহায়তা করে আসছে। এই আইনি লড়াই চলা অবস্থায় ২য় মামলা পরিচালনাকারী মো. আলাউদ্দিন মিয়াও এক রকম বিনা চিকিৎসায় ২০০৮ সালের ২০ অক্টোবর মারা যান। এমনিভাবে মিলের আরও অনেক শ্রমিক অনাহারে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন। তৃতীয় মামলা পরিচালনাকারী মো. আ. হাই মুন্সী (তিনিও শ্রমিক) মামলা তদারকির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

এমতাবস্থায় Civil Revision No. 1976 of 2010, Sonali Bank filed Artha Rin Suit No. 240 of 2003 in the Artha Rin Adalot No.1 Dhaka on 29 April 2003 for realization of the debt of Taka 980, 967, 466.67 against the Jute mills. সোনালী ব্যাংকের এই পিটিশন দায়েরের প্রেক্ষিতে মহামান্য হাইকোর্ট শ্রমিকদের পাওনাদিকে অগ্রাধিকার দিয়ে ২/৪/২০১৭ এই মর্মে রায় দেন যে, ৩৫০ জন শ্রমিকের ১০% হারে ক্ষতিপূরণসহ পাওনাদি পরিশোধের পর অবশিষ্ট টাকা সোনালী ব্যাংক পাবে। এই রায়ে শ্রমিকরা আশার আলো দেখতে শুরু করেছিলেন, তারা ভেবেছিলেন নিশ্চয়ই এবার তাদের সারা জীবনের কষ্টার্জিত পাওনাদি বুঝে পাবেন।

শ্রমিকদের পাওনাদি পাওয়ার আশায় যেখানে তারা সুখের দিন গুনছে, সেখানে নতুন করে বাদ সাধে বিজেএমসি। বিজেএমসি আবেদন করেন যে, যে শর্তে ব্যক্তি মালিকানায় মিল দেয়া হয়েছিল, সে শর্ত মালিকপক্ষ পূরণে ব্যর্থ হয়েছে তাই বিজেএমসি তার মিল ফেরত নিয়ে নিবেন। এই মর্মে হাইকোর্টের অন্য একটি বেঞ্চ ১৯/৪/২০১৭ ইং একটি অর্ডার দেন।

বিজেএমসির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি, আইনের দ্বারে ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত ৩৫০ জন শ্রমিকের পাওনাদি পরিশোধ করে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে বেঁচে থাকার সুযোগ করে দিবেন। গত ২৮ অক্টোবর ২০২০ আমাদের সময় পত্রিকায় দেখলাম খুলনা অঞ্চলের ৩৬ হাজার ৩৯৫ জন জুট মিল শ্রমিক তাদের চূড়ান্ত পাওনার অপেক্ষায় রয়েছেন। তাহলে কেন মাদারীপুর এ আর হাওলাদার জুট মিলের শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হবেন?

ইতোমধ্যে ৩য় মামলা তদারককারী মো. আ. হাই মুন্সী তিনি গত ১ ডিসেম্বর ২০১৯ ইং তারিখে আকস্মিক সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে তার মৃত্যু রহস্যজনক বলে দাবি করা হয়েছে। দীর্ঘ আইনি সহায়তা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পক্ষে শ্রমিকদের পাওনাদি আদায়ের আইনি সহায়তা করতেন অ্যাডভোকেট ইদ্রিসুর রহমান। তিনি ছিলেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্যানেল ল’ইয়ার। কিন্তু গত ২৪ জুন ২০২০ ইং তারিখে করোনায় আক্রান্ত হয়ে তিনি ইন্তেকাল করেন। এমতাবস্থায় শ্রমিকদের তিন দশকের আইনি লড়াইয়ের চূড়ান্ত বিজয়ের ফলাফল অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। তাহলে কি আইনের সব রায় অসহায় শ্রমিকদের পক্ষে থাকা সত্ত্বেও তারা তাদের সারা জীবনের কষ্টার্জিত ন্যায্য পাওনাদি থেকে বঞ্চিত হবে? নাকি আইনের গ্যাঁড়াকলে দশকের পর দশক ঘুরে অনাহারে, বিনা চিকিৎসায় ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর কোলে বিলীন হবেন?

আমার বাবা মরহুম আনিসুর রহমান সম্পর্কে দু’একটি কথা না বললেই নয়। তিনি ছিলেন একজন সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা ও আদর্শবান শ্রমিক নেতা, জীবনে কখনও কোন অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেননি, আজীবন মেহনতী মানুষের অধিকার আদায়ে লড়াই করে গেছেন। তবে বাবা ১৯৯৬ সালে মারা যাওয়ার পর রাশেদ খান মেনন (চাচা) বাবাকে নিয়ে একটি আর্টিকেল লিখেছিলেন সেখানে তিনি বাবাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। ওই সময়ে দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় লেখাটি ছাপা হয়েছিল।

বাবা ওয়ার্কাস পার্টি করতেন। রাশেদ খান মেনন, কাজী জাফর আহমেদ, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অ্যাডভোকেট আদিলুর রহমান খানসহ অনেক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা বাবাকে তার সততার জন্য শ্রদ্ধা করতেন। ১৯৯১ সালে আমি ক্লাস এইটে পড়ি। আমরা তখনও মিল কলোনিতে থাকি। মিল বন্ধ, আমাদের ঘরে কয়েক মণ ধান কেনা ছিল, মা ভেবেছিলেন ধানগুলো সিদ্ধ করে ফেলি। তাহলে আর বাবা কাউকে ওই ধান দেবে না। কিন্তু মায়ের সেই পরিশ্রম বৃথা গেছে। বাবা সেই সিদ্ধ করা ধান অন্য শ্রমিকদের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিলেন এই বলে আমার সন্তানেরা খাবে আর অন্য শ্রমিকের সন্তানেরা উপোস থাকবে এটা হতে পারে না। যতক্ষণ খাবার আছে, ততক্ষণ সবাই খাবে। জীবনে কখনও টাকা জমিয়ে রাখেননি। শ্রমিক মানে নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাই যখনই কোন শ্রমিক অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়েছেন, বাবা নিজের সাধ্যমতো তাকে সহযোগিতা করেছেন। এরশাদ সরকারের সময় কাজী জাফর আহমেদ তখন মন্ত্রী তিনি বাবাকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, যে আমি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় আপনি একটা ট্রেড লাইসেন্স করে নেন। কিন্তু বাবা তার প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। শুধু একটি কথাই বলেছেন যে আমি বিনা পরিশ্রমে কারও কাছ থেকে সুবিধা গ্রহণ করতে পারব না।

এমনিভাবে মালিকপক্ষও বাবাকে অনেক লোভনীয় প্রস্তাব দিয়েছিলেন যে, আপনি শ্রমিকদের পক্ষ হয়ে মামলায় লড়বেন না, অনেক শ্রমিকই তো আপনার সঙ্গে থাকেনি আমাদের সঙ্গে আপোস করে মামলা তুলে নিয়েছেন, আপনি কেন এই সুযোগ হাতছাড়া করবেন। আপনি মামলায় জিতে আর কত টাকা পাবেন, তার থেকে অনেক গুণ বেশি টাকা দেব, যদি অবশিষ্ট শ্রমিকদের পক্ষ হয়ে আপনি মামলা তুলে নেন। কিন্তু মৃত্যুর আগ পর্যন্ত কঙ্কালসার দেহ নিয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা গেছেন তবুও অন্যায়ের সঙ্গে আপোস করেননি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি এটাই বিশ্বাস করে গেছেন যে, অবশ্যই শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য পাওনা পাবে।

জানিনা বাবার এই শ্রমিকদের জন্য অধিকার আদায়ের লড়াই, সারা জীবনের পরিশ্রম আইনের সব স্তরে পাওনাদি পাওয়ার রায় পাওয়া সত্ত্বেও কি শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি পাওনা থেকে বঞ্চিত থাকবেন?

[সৌজন্যে : আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)]

দেশ ও জাতির স্বার্থে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়াতে হবে

দেশ ও জাতির স্বর্থে আয়কর চলতি (২০২০-২১) করবর্ষে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়াতে হবে।

শেয়ারবাজার স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগ আচরণের ভূমিকা

করোনাভাইরাসের বয়স প্রায় এক বছর হতে চলল, এর বিস্তার কবে থামবে তা এখনও কেউ হলফ করে বলতে পারে না।

দেশটা কি মগের মুল্লুক

বিদেশে টাকা পাচার হচ্ছে এ কথাটি বহু বছর ধরে শুনছি। আমাদের দেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা যে বিদেশে পাচার হচ্ছে তা আদালতে প্রমাণও হয়েছে।

দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা

দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা। সংক্ষেপে আরপি সাহা। একজন সংগ্রামী, আত্মপ্রত্যয়ী মানবসেবক।

করোনাকালীন শহীদ মিলন দিবস পালন

image

ম্রো পল্লী এবং পাঁচতারা হোটেল

আমাদের সবার ভেতরেই প্রকৃতির জন্য এক ধরনের ভালোবাসা আছে। আমরা সবাই মনে মনে স্বপ্ন দেখি আমরা কোন একদিন একটা গহীন গ্রামে ফিরে যাব।

তিতুমীর : ব্রিটিশবিরোধী প্রথম বাঙালি শহীদ

image

লবণাক্ত ও খরাপ্রবণ অঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি ডাল চাষে সাফল্য

বাংলাদেশের মোট স্থলভাগের প্রায় এক-তৃতীয়াংশই উপকূলীয়; যার আয়তন প্রায় ৮৭ হাজার ২১১ বর্গকিলোমিটার এবং এ উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৫৩ শতাংশই লবণাক্ত।

আর্মেনিয়া-আজারবাইজানের যুদ্ধ

নাগোর্নো-কারাবাখ অঞ্চল নিয়ে আর্মেনিয়া এবং আজারবাইজানের পুরাতন দ্বন্দ্বই গত সেপ্টেম্বরের যুদ্ধে পর্যবসিত হয়।