ঐক্যের শিক্ষায় শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা

গৌরমোহন দাস

image

বিশ্ববরেণ্য দার্শনিক ড. মহানামব্রত ব্রহ্মচারীজী বলেছেন- ‘ঈশ্বরের সহিত সম্বন্ধ পাতাইবার যত প্রকার উপায় মানুষ আবিষ্কার করিয়াছে, তন্মধ্যে পূজাই সর্বশ্রেষ্ঠ।’ তাই তো, ঋতুর রানী শরৎ এলেই মা আসছেন, মনে রব ওঠে যায়। এ বছর অবশ্য হেমন্তে অনুষ্ঠিত হচ্ছে দুর্গাপূজা। আহা! কী আনন্দ আকাশে বাতাসে ...! ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে’। আমরা আনন্দ নিয়ে মায়ের আগমন কামনা করি। কেন? আমাদের মাঝে ঐক্য থাকলে নিরানন্দ হওয়ার কারণ নেই। তাই প্রার্থনায় আমরা প্রণাম জানাই।

দুষ্ট প্রকৃতি বা অসুরদের অত্যাচারে পৃথিবী যখন অতিষ্ঠ, শান্তিপুরী স্বর্গ থেকে দেবতাগণ হন বিতাড়িত। কোনভাবেই তারা মুক্তির উপায় পাচ্ছিলেন না। তখন অসহায় দেবতাগণ ব্রহ্মা (সৃষ্টিকর্তা), বিষ্ণু (পালনকর্তা) ও মহেশ্বরের (ধ্বংসকর্তা) স্মরণাপন্ন হন। শেষে ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর ত্রিশক্তির সম্মিলিত তেজরাশি থেকে এক নারীর আবির্ভাব হয়। তিনিই হলেন দেবী দুর্গা। নারীর আবির্ভাব কেন? মহিষাসুর, ব্রহ্মার নিকট থেকে বর লাভ করেছিল যে, কোন পুরুষশক্তি তাকে বধ করতে পারবে না। ফলে তারা সৃষ্টি করেন এক নারীশক্তি দেবী দুর্গা। শব্দকল্পদ্রুম গ্রন্থমতে দুর্গা নামের বিশ্লেষণ হলো- দন্ড দৈত্যনাশক, উ- বিঘ্ননাশক, (রেফ)- রোগনাশক, গ-পাপঘ্ন, আ- ভয় ও শত্রুনাশক। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ, ভয় ও শত্রু হতে যিনি রক্ষা করেন তিনিই দুর্গা। মার্কন্ডেয় পুরাণমতে- দুর্গম নামক অসুরকে বধ করায় দেবীর নাম হয় দুর্গা। তিনি সবার আর্তি বা বেদনা হরণ করেন ‘সর্বস্যার্তিহরে দেবি!’ (শ্রীশ্রী চন্ডী-১১/১২)।

যখন মর্মার্থ বুঝি না তখন থেকেই দেখে আসছি বিভিন্ন সংগঠনের প্যাডের পাতায় শীর্ষে মুদ্রিত থাকে ‘ঐক্য শান্তি প্রগতি’। সত্যিই তো; তবে কথাগুলো সংগঠনের পাতায় থাকবে কেন? সংগঠন মানে বিভিন্ন অঙ্গের সংযোগ সাধন, একতা, ঐক্য, দলগত শক্তি বা মহাশক্তি। দলগত শক্তিতে শান্তি বিরাজ করে। আর যেখানে শান্তি সেখানে উন্নতি নিঃসন্দেহে। আমাদের সার্বজনীন মহোৎসব শারদীয় শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা। সমাজের নীচু থেকে উঁচু শ্রেণীর পেশায় নিয়োজিত সবার অংশগ্রহণ থাকে এ পূজায়। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে একসঙ্গে পূজায় মায়ের চরণে অঞ্জলি নিবেদন করে, সকলে আনন্দ উপভোগ করে। ঐক্যের পূজা শারদীয় দুর্গাপূজা। শারদীয়া মহোৎসবে দেবী আমাদের ঐক্যের শিক্ষাদান করেন। কীভাবে? প্রথমেই নজর দেয়া যাক- শ্রীশ্রী দুর্গা মায়ের কাঠামোর দিকে। কাঠামোতে মায়ের সঙ্গে আছে- সুর বা দেবশক্তি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, চালচিত্রে আছেন মঙ্গলকারী শিব; আছে অসুর শক্তি মহিষাসুর। মন্ত্রেও আছে- ‘তিষ্ঠ দেবগণৈঃ সহ।’ অর্থাৎ সকল দেবতাসহ তুমি পূজামন্ডপে বিরাজ কর। শুধু তাই নয়, কুমার প্রতিমা গড়ে, পুরোহিত পূজা করান, নাপিত দর্পণ দেয়, মালী ফুল জোগায়, বাদ্যকর ঢাক বাজায় মানে সবার সম্পৃক্ততা থাকে দুর্গাপূজায়। শুভ বিজয়ায় উদার মিলন; মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সকলে উদারচিত্তে শুভেচ্ছা বিনিময় করে। সনাতন ধমাবলম্বীরাও সকল ধর্মমতের লোকজনের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। ঐক্যের সুতায় এই উৎসব সকলের মিলন মেলায় পরিণত হয়। তাই এই উৎসব একটি সার্বজনীন ও জাতীয় উৎসব।

শ্রীমদ্ভগবদ্গীতায় (৪/১৩) শ্রীভগবান বলেছেন- চতুর্বর্ণ্যাং ময়া সৃষ্টং গুণকর্মবিভাগশ অর্থাৎ মানুষের গুণ ও কর্ম অনুসারে আমি ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, কূদ্র এই চার শ্রেণিতে বিভাজন করেছি। যারা জ্ঞানচর্চা বা শিক্ষাদানে নিয়োজিত থাকে তারা ব্রাহ্মণ। যেমন শিক্ষক। যারা রক্ষা কাজে নিয়োজিত থাকে তারা ক্ষত্রিয়। যেমন সৈনিক। যারা ব্যবসা-বাণিজ্য বা কৃষিকাজে নিয়োজিত থাকেন তিনি বৈশ্য। যেমন বিল গেটস। আর যারা সরকারি-বেসরকারি চাকরি করেন বা অন্যের সেবায় নিয়োজিত থাকেন তারাই কূদ্র। সমাজের এই চার শ্রেণির সমাবেশ শ্রীশ্রী দুর্গা মায়ের কাঠামোতে। বিদ্যাদেবী সরস্বতী- ব্রাহ্মণ, দেবসেনাপতি কার্তিক-ক্ষত্রিয়, ধনদেবী লক্ষ্মী-বৈশ্য এবং গণপতি গণেশ হলেন-কূদ্র। এই চারশক্তি একত্রে থাকলে সুশৃঙ্খল ও প্রগতিশীল সমাজ গঠন সম্ভব। লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, শিব পৃথক পৃথকভাবে তাদের পূজা করা হয়। ঐক্যের শিক্ষাতেই শ্রীশ্রী দুর্গা মায়ের সঙ্গে তাঁদেরও পূজা করা হয়।

এবার নজর দেয়া যাক মায়ের সঙ্গে পূজিত বাহনের দিকে। বাহন হিসেবে সিংহ, হাঁস, ময়ূর, পেঁচা, ইঁদুর ছোট-বড় প্রভৃতি প্রাণী রয়েছে। দেবী সকল দেবতার সম্মিলিত শক্তি, তার বাহন সিংহ। আকৃতিতে বড়, সকল পশুর শক্তির প্রতীক পশুরাজ সিংহ। সুশ্রী ময়ূর কামরহিত। সমাজে অসুর স্বভাবের মানুষকে কাম থেকে বিরত থাকার শিক্ষা দেয়। কুশ্রী পেঁচা দিবান্ধ। যারা ঈশ্বরকে ভুলে লোভ-লালসায় মত্ত হয়ে অসৎ পথে অর্থোপার্জন করে তারাও সমাজের কুশ্রী। পেঁচা তাদের অসৎ পথ থেকে বিরত থাকতে বলে। গজমুন্ড যার শিরোভূষণ তিনি হলেন গণেশ। গণেশ সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী বৃহৎ জীব হাতির মাথাকে শিরোভূষণ করেছেন এবং অতিশয় ক্ষুদ্র ও উপেক্ষিত ইঁদুরকে বাহন হিসেবে গ্রহণ করেছেন। দেখিয়েছেন বৃহতের সঙ্গে ক্ষুদ্রের সমাবেশ। কারণ সমাজে কেউ আবহেলা/ফেলনা নয়। জনতার শক্তিই বড় শক্তি। তিনি বলছেন সমাজে উঁচু-নীচু, ধনী-দরিদ্র সকলেরই প্রয়োজন রয়েছে। জালে জড়ালে বড় জন্তুকেও মূষিক উদ্ধার করতে সক্ষম। তেমনি সমাজে বড় হতে হলে ছোটকে সঙ্গে নিয়েই বড় হতে হয়। সরস্বতীর বাহন হাঁস, অসারকে ফেলে সার গ্রহণ করে। দুধ ও জল মিশ্রণ করে দিলে হাঁস জল ফেলে শুধু দুধটুকু গ্রহণ করে নেয়। কিংবা কাদায় মিশ্রিত স্থান থেকেও তার খাদ্য খটুজে নিতে পারে। মায়ের সঙ্গে পূজিত হয়ে শিক্ষা দিচ্ছে- আমরাও যেন সকল অসার বা ভেজাল পরিহার করে সার বা ভাল কিছু নিয়ে সুন্দর পথে চলতে পারি। আবার বাহন- সিংহ, হাঁস, ময়ূর, পেঁচা, ইঁদুর, ষাঁড় ছোট-বড় প্রভৃতি প্রাণী দেবীর সঙ্গে শোভিত হচ্ছে। কেন? কারণ প্রকৃতির সুরক্ষায় সেসব প্রাণীর ভূমিকা যেমনি অপরিসীম তেমনি সিংহ- ষাঁড়কে, ময়ূর- সাপকে, কিংবা পেঁচা-ইঁদুরকে দেখেও তেড়ে না এসে, হিংসা-বিবাদ ভুলে গিয়ে মায়ের আদর-শাসনে একত্রে রয়েছে; তারা আমাদেরও একত্রে থাকার শিক্ষা দিচ্ছে।

ষষ্ঠী থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত ৫ (পাঁচ) দিনব্যাপী মহাসমারোহে শারদীয়া পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এ পূজায় দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহারেরও রয়েছে সার্বজনীনতা। পঞ্চ পল্লব, পঞ্চ শস্য, পঞ্চগব্য, ফুল, ফল, দুর্বা, তুলসী প্রভৃতি; সপ্তঘাটের জল থেকে শিশির কতা, দেবদ্বারের মৃত্তিকা থেকে বারবণিতার দ্বারের মৃত্তিকাসহ অনেক কিছু শ্রীশ্রী দুর্গাপূজায় লাগে। বারবণিতার মাটি কেন? বারবণিতারাও সমাজের একটি অংশ। রক্ষা করছে সমাজের বিশাল একটি অংশকে। তাদেরও সমাজে বেঁচে থাকার অধিকার আছে; আছে মায়ের পূজার করার অধিকার। তাদেরও যেন অবহেলার দৃষ্টিতে না দেখেন এবং সমাজের ঐক্য তথা তাদের মায়ের পূজায় সম্পৃক্ত করার জন্যই পূজায় বারবণিতার দরজার মাটি প্রয়োজন। সমাজে কেউ মাতৃপূজায় বঞ্চিত না হোক এমনটাই কামনা।

সপ্তমীপূজায় দেবীর পাশে সাদা কাপড়ে সাজানো থাকে নবপত্রিকা। সেখানে রয়েছে কৃষি সম্প্রসারণ তথা প্রকৃতি পূজার উপকরণ। কলা, কালোকচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু, ধান নয়টি ঔষধি বৃক্ষের গুণাগুণ বিচার করে আর্য-ঋষিগণ ঐ বৃক্ষ পূজার বিধান করে দিয়েছেন। অজ্ঞতায় অনেকে এই নবপত্রিকাকে কলাবউ বা গণেশের বউ বলে থাকেন। যা মোটেও ঠিক নয়। অষ্টমীপূজায় শ্রীশ্রী দুর্গাপূজার অন্যতম অঙ্গ হলো কুমারীপূজা। কুমারী কন্যা নমস্য। কুমারীপূজার তাৎপর্য হলো- নারী দেবী বা শক্তির উৎস। মাতৃজাতিকে মায়ের আসনে অধিষ্ঠিত করার প্রয়াশই শ্রীশ্রী কুমারী পূজার আয়োজন। সবার সে চিন্তাবোধ জাগ্রত থাকা উচিত।

সকল বর্ণের লোকজন ও সকল বস্তুর সমন্বয়ে শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা। ঐক্যের পূজা। ঐক্যশক্তিতেই সৃষ্ট শ্রীশ্রী দেবী দুর্গা। পূজার সময় পুরোহিতের উপরে পূজার ভার ন্যস্ত করে অন্য কাজে রত না থেকে সকলে পূজামন্ডপে বসে যেনো স্নান হোমাদি দর্শন করি। তার পূজায় একতার শিক্ষা নিয়ে, প্রার্থনা করি- সকল আসুরিকতার বিনাশ হোক। পবিত্র বৈদিক মন্ত্রে আমরা বলি-সংগচ্ছধ্বং সংবদধ্বং সং বো মনাংসি জানতাম /দেবা ভাগং যথা পূর্বে সং জানানা উপাসতে/সমানো মন্ত্র সমিতিঃ সমানী সমানাং মনঃসহ চিত্তমেষাম/সমানং মন্ত্রমভিমন্ত্রয়ে সঃসমানেন বো হবিষা জুহোমি। (ঋগ্বেদ-১০/১৯১, ২-৩) অর্থাৎ তোমরা সকলে একসঙ্গে চল। এক চিন্তাধারায় স্নাত হয়ে সবে একসঙ্গে বল। সকলে জান সকলের মনকে। ভালোবাস সবাইকে। সকলের মন্ত্র, সংকল্প ও মন এক হোক, এক হোক, এক হোক।

[লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু সমাজ সংস্কার সমিতি]

আশুরার বিলের বাঁধবিরোধী আন্দোলন

ফগা হাঁসদার কাছে বেশকিছু দিন সাঁওতালি বনবিদ্যা শিখতে গিয়েছিলাম।

আইনের গ্যাঁড়াকলে তিন দশক শ্রমিকের পাওনাদি

এ আর হাওলাদার জুট মিল মাদারীপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এই মিলে প্রায় ১৪০০ শ্রমিক কাজ করতেন। এই মিলকে ঘিরে মাদারীপুর শহর তখন জমজমাট ছিল।

মার্কিন নির্বাচন : গণতন্ত্রেরই জয় হবে

image

আবুল হাসনাত : একজন নিভৃতচারীর গল্প

image

গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের আদর্শ অটুট থাক

image

কোথায় আকবরের ক্ষমতা

image

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন

image

বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার কীভাবে মানবকল্যাণে অবদান রাখবে

image

মুরাদনগরই আসল বাংলাদেশ?

জন্মেছি ১৯৩৩ সালে। দেখেছি ইংরেজ শাসিত ভারত। অতঃপর ২৩ বছর ধরে দেখলাম অনাকাক্সিক্ষত দেশ পাকিস্তানকে।