দুর্গাপূজার ইতিকথা ও বাংলায় দুর্গোৎসবের প্রচলন

আকাশ বড়ুয়া

ঢাকে কাঠি পড়বে, বাজবে শঙ্খ, মন্ডপ মন্ডপে ধুপের সুগন্ধি, ভক্তকুলের আরাধনা আর ধনুচি নাচে মেতে উঠবে সব সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। দুর্গাপূজা বলে কথা। ষষ্ঠী থেকে দশমী চলবে দেবী বন্দনা।

দুর্গা (যিনি দুর্গতি বা সংকট থেকে রক্ষা করেন ও যে দেবী দুর্গম নামক অসুরকে বধ করেছিলেন) হলেন হিন্দু দেবী পার্বতীর এক উগ্র রূপ। তিনি একজন জনপ্রিয় দেবী। হিন্দুরা তাকে মহাশক্তির একটি উগ্র রূপ মনে করেন। তিনি দেবী পার্বতীর উগ্র রূপ, তার অন্যান্য নামসমূহ হলো- চন্ডিকা, যোগমায়া, অম্বিকা, বৈষ্ণবী, মহিষাসুরসংহারিণী নারায়ণী, মহামায়া, কাত্যায়নী ইত্যাদি। দেবী দুর্গার অনেকগুলো হাত। তার অষ্টাদশভুজা, ষোড়শভুজা, দশভুজা, অষ্টভুজা ও চতুর্ভুজা মূর্তি দেখা যায়। তবে দশভুজা রূপটিই বেশি জনপ্রিয়। তার বাহন সিংহ (কোনো কোনো মতে বাঘ)। মহিষাসুরমর্দিনী-মূর্তিতে তাকে মহিষাসুর নামে এক অসুরকে বধরতা অবস্থায় দেখা যায়।

অথচ দুর্গাপূজর ইতিহাস বলতে আমরা জানি রামের অকালবোধন। বাংলার পাড়ায় পাড়ায় কীভাবে দুর্গাপূজার সূচনা হলো? সংগৃহীত কিছু তথ্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায়- কেউ কেউ ধারণা করেন, সিন্ধু সভ্যতায় (হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারো সভ্যতা) দেবীমাতার, ত্রিমস্তক দেবতা, পশুপতি শিবের পূজার প্রচলন ছিল। দুর্গা শিবের অর্ধাঙ্গিনী- সেই হিসেবে অথবা দেবী মাতা হিসেবে পূজা হতে পারে।

অপরদিকে রামচন্দ্রের মাধ্যমে দুর্গাপূজার প্রচলনের কথা লোকমুখে প্রচলিত থাকলেও মূল বাল্মীকির রামায়ণে, দুর্গাপূজার কোন অস্তিত্ব নাই। কিন্তু কৃত্তিবাসী রামায়ণে দুর্গাপূজার অস্তিত্ব আছে। কৃত্তিবাসী রামায়ণের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো- এটি মূল রামায়ণের আক্ষরিক অনুবাদ নয়। কৃত্তিবাস কালিকা পুরাণের ঘটনা অনুসরণে ব্রহ্মার পরামর্শে রামের দুর্গাপূজা করার কথা উল্লেখ করেছেন। শক্তিশালী রাবণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিজয় নিশ্চিত করতে শরৎকালে শ্রী রামচন্দ্র কালিদহ সাগর থেকে ১০১টি নীল পদ্ম সংগ্রহ করে প্রাক-প্রস্তুতি হিসেবে দুর্গাপূজা করে দুর্গার কৃপা লাভ করেন বলে কৃত্তিবাস ওঝা বর্ণনা করেছেন। তবে দুর্গাপূজার সব চাইতে বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায় মার্কন্ডয়ে পুরানে। যেখানে মহির্ষী জৈমিনি ও মহির্ষী মার্কন্ডয়ের কথোপকথনের ভিত্তিতে পুরাণটি রচিত হয়। এই পুরাণের মধ্যে তেরোটি অধ্যায় দেবীমহাত্ম্যম নামে পরিচিত। বাংলায় শ্রীশ্রী চন্ডি নামে সাতশ’ শ্লোকবিশিষ্ট দেবী মহাত্ম্যম পাঠ আছে- যা দুর্গাপূজার প্রধান ও অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে পূজার আসরে স্থায়ী হয়ে গেছে।

মার্কন্ডয়ে পুরান মতে, চেদী রাজবংশের রাজা সুরাথ খ্রিস্টের জন্মের ৩০০ বছর আগে কলিঙ্গে (বর্তমানে ওড়িষ্যা) দুর্গাপূজা প্রচলন করেছিল। পুরাণ মতে, দুর্গাপূজার ইতিহাস আছে কিন্তু ভক্তদের কাছে সেই ইতিহাস প্রামাণিক নয়, বিশ্বাসের। মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যে দুর্গাপূজার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। ১১ শতকে অভিনির্ণয়ে, মৈথিলী কবি বিদ্যাপতির দুর্গাভক্তিতরঙ্গিনীতে দুর্গা বন্দনা পাওয়া যায়। বঙ্গে ১৪০০ শতকে দুর্গাপূজার প্রচলন ছিল কিনা ভালোভাবে জানা যায় না।

ঘটা করে দুর্গাপূজা চালুর আগে কিছু কিছু উচ্চবর্ণ হিন্দুদের গৃহকোণে অত্যন্ত সাদামাঠাভাবে ঘরোয়া পরিবেশে এই পূজা চালু ছিল। আর ঘটা করে দুর্গাপূজার ইতিহাস, খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। তবে কখন থেকে ঘটা করে এই পূজা চালু হলো- তা নিয়ে পরিষ্কার বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। যতটুকু জানা যায় তা হলো- কারো মতে, ১৫০০ খ্রিস্টাব্দের শেষের দিকে দিনাজপুরের জমিদার প্রথম দুর্গাপূজা করেন। আবার কারো মতে, ষোড়শ শতকে রাজশাহী তাহেরপুর এলাকার রাজা কংস নারায়ণ প্রথম দুর্গাপূজা করেন। ১৫১০ সালে কুচ বংশের রাজা বিশ্ব সিংহ কুচবিহারে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। অনেকে মনে করেন, ১৬০৬ সালে নদীয়ার ভবনানন্দ মজুমদার দুর্গাপূজার প্রবর্তক। ১৬১০ সালে কলকাতার বরিশার রায় চৌধুরী পরিবার প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন বলে ধারণা করা হয়। ১৬১০ সালে কলকাতার সাবর্ণ রায় চৌধুরী পরিবার দুর্গার ছেলেমেয়েসহ সপরিবারে পূজা চালু করেন।

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছে দেবী দুর্গা পরম ভক্তিময়। তার এক রূপ অসুরবিনাশী, আরেক রূপ মমতাময়ী মাতার। তিনি অশুভর প্রতীক অসুরদের দলপতি মহিষাসুরকে বধ করে দেবকুলকে রক্ষা করেছিলেন। আমাদের বিশ্বাস, এর মধ্য দিয়ে অন্যায়-অশুভর বিপরীতে ন্যায় ও শুভশক্তির জয় হয়েছিল। তিনি কেবল সৌন্দর্য-মমতা-সৃজনের আধারই নন, অসহায় ও নিপীড়িতের আশ্রয় দানকারী বলেও গণ্য হন।

মাতৃ আরাধনা তখনই সার্থক হয়ে উঠবে, যখন ঘরে ঘরে দুর্গার মতো মেয়েদের প্রকাশ ঘটবে। সেটা কি হয়েছে? বছর বছর ঢাকঢোল বাজিয়ে দুর্গতিনাশিনীর আরাধনা করেও কেন আমাদের দুর্গতি দূর হচ্ছে না। শ্রীশ্রী ঠাকুর বলেন, ‘পূজা-পার্বণ তুই যতই করিস/ ফুল, তুলসী, গঙ্গা জলে/ অনুশীলনী কৌশল ছাড়া/ ফল পাবে না কোন কালে।’

তাই দুর্গাপূজা শুধু পুষ্প-পত্রবল্লভের এবং ঢাকঢোলের পূজা নয়। এ পূজা মানবতার এক বিরাট মিলন উৎসব।

আশুরার বিলের বাঁধবিরোধী আন্দোলন

ফগা হাঁসদার কাছে বেশকিছু দিন সাঁওতালি বনবিদ্যা শিখতে গিয়েছিলাম।

আইনের গ্যাঁড়াকলে তিন দশক শ্রমিকের পাওনাদি

এ আর হাওলাদার জুট মিল মাদারীপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত। এই মিলে প্রায় ১৪০০ শ্রমিক কাজ করতেন। এই মিলকে ঘিরে মাদারীপুর শহর তখন জমজমাট ছিল।

মার্কিন নির্বাচন : গণতন্ত্রেরই জয় হবে

image

আবুল হাসনাত : একজন নিভৃতচারীর গল্প

image

গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদের আদর্শ অটুট থাক

image

কোথায় আকবরের ক্ষমতা

image

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন

image

বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার কীভাবে মানবকল্যাণে অবদান রাখবে

image

মুরাদনগরই আসল বাংলাদেশ?

জন্মেছি ১৯৩৩ সালে। দেখেছি ইংরেজ শাসিত ভারত। অতঃপর ২৩ বছর ধরে দেখলাম অনাকাক্সিক্ষত দেশ পাকিস্তানকে।